পরিচিতি

জামিয়া নুরিয়া ইসলামিয়া

পরিচিতি

জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়ার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. এর খলিফা উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুযুর্গ, ওলীকুল শিরমনী, আমীরে শরীয়ত হযরত মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. বর্তমান বিশ্ব-ইতিহাসে এক সুপরিচিত অনন্য ব্যক্তি। তিনি বাংলাদেশে বহু দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁরই মুবারক হাতে ১৩৮৪ হিজরী, ১৯৬৪ ইং সনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে মাদ্রাসা-ই-নূরিয়া। দ্বীনি শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে সর্বোচ্চ স্তর চালু করার প্রত্যয়ে ১ নভেম্বর ১৯৯৮ ইং তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে মাদ্রাসাকে জামিয়ায় উন্নীত করে জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া’(নূরিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়) করা হয়েছে। বর্তমানে জামিয়া নূরিয়া দেশের দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারী একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যা রাজধানী ঢাকার প্রান্তসীমায় আশরাফাবাদ, কামরাঙ্গীরচর এলাকায় নির্মল আবহাওয়ার এক অর্পূব প্রাকৃতিক পরিবেশে দ্বীনি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

দ্বীনি জ্ঞানের প্রচার-প্রসার ও আকাবীরে উম্মতের চিন্তা-চেতনার বিকাশ ও তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আদর্শ হিফজুল কুরআন বিভাগ, আদর্শ মক্তব (প্রাইমারী) বিভাগ, স্বতন্ত্র ইয়াতিমখানা ও প্রয়োজনীয় বাংলা, ইংরেজীসহ দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স), কিসমুল ইফতা (ফতোয়া বিভাগ), শিক্ষা প্রশিক্ষণ কোর্সসহ সকল প্রকার দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন বিভাগে শতাধিক সুযোগ্য শিক্ষকমন্ডলী ও কর্মচারী দ্বারা জামিয়া নূরিয়া সুচারুরুপে পরিচালিত হয়ে আসছে। এছাড়া শিক্ষাদানের সাথে সাথে ফতোয়া বিভাগ, উন্নত চরিত্র গঠন ও আত্মিক শিক্ষা বিস্তারে আধ্যাত্মিক সাধনাগার বা খানকাহ এর ব্যবস্থা জামিয়া নূরিয়ার উল্লেখযোগ্য বিশেষ দিক।

জামিয়ার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য:

কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক তালীম-তারবিয়্যাতের মাধ্যমে হক্কানী আলেম ও দ্বীনের দাঈ তৈরি করে যুগচাহিদার ভিত্তিতে দ্বীনের সকল দাবী পুরণে সক্ষম ব্যক্তি গঠনের লক্ষ্যে তাদেরকে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান এবং এই প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে দুনিয়ার কল্যাণ ও আখিরাতের মুক্তির পথ সুগম করা, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা বিশ্বাস ও ফিকহে হানাফির সংরক্ষণ এবং আকাবীরে দেওবন্দের অনুকরণে পূর্ণাঙ্গ দ্বীনি শিক্ষার যথাযথ বাস্তবায়ন। ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী সকল বাতিল শক্তির মোকাবেলাপূর্বক সমাজ থেকে নাস্তিক্যবাদ ও সকল প্রকার শিরক বিদাতের মূলোৎপাটন এবং বিপ্লবী তৎপরতার ধারাবাহিকতায় সমাজের সর্বস্তরের ন্যায়নীতি ও ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তন, সমাজ ও দেশের প্রতিটি সদস্যের আত্মিক পরিশুদ্ধি, দ্বীনি সচেতনতা বৃদ্ধি ও মানবিক গুণাবলী বিকাশের মাধ্যমে দ্ব›দ্বমুখর অশান্ত এ সমাজকে সুশীল সমাজে রুপান্তর করা।

জামিয়ার কর্মধারা:

জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে একটি সর্বোচ্চ ইসলামী বিদ্যাপীঠ। যেখানে শিশুশ্রেণি হতে শুরু করে সর্বোচ্চ ইসলামী শিক্ষা দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) এবং ইফতা (উচ্চতর ইসলামী আইন গবেষণা বিভাগ) পর্যন্ত শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সুচিন্তিত ও সুনিয়ন্ত্রিত এ শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কুরআন, হাদীস, ফিকাহ, উসূল, আকাঈদ ইত্যাদি মৌলিক শিক্ষার পাশাপাশি আরবী, উর্দূ, বাংলা, অংক, ইংরেজী, ব্যাকরণ, সমাজ, ভূগোল, ইতিহাস ও যুক্তিবিদ্যা যথাযথভাবে শিক্ষা দেয়া হয়।

জামিয়ার বিভাগসমূহ 

১. শিক্ষা বিভাগ

২. সাধারণ জ্ঞান প্রশিক্ষণ বিভাগএবং

৩. সেবা বিভাগ।

শিক্ষা বিভাগ 

মক্তব/প্রাইমারী:
এ বিভাগে ছাত্রদেরকে দুইভাগে শিক্ষা দেয়া হয়ে থাকে। 
প্রথম ভাগ- রওজাতুল আতফাল (কিন্ডারগার্টেন)।
দ্বিতীয় ভাগ- নূরিয়া মক্তব।

রওজাতুল আতফালের ছাত্রদেরকে বাংলা, অংক ও ইংরেজীর পাশাপাশি প্রাথমিক স্তরের মাসয়ালা-মাসায়েলসহ পূর্ণ কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াতের উপযোগী করে তোলা হয়। নূরিয়া মক্তবের ছাত্রদেরকে আধুনিক পদ্ধতিতে মাত্র চারমাসে নাজেরা বিভাগে উন্নিত করা হয়। অত:পর  স্বল্প সময়ে হিফজ করার উপযুক্ত করে তোলা হয়। 

হিফজ বিভাগ:
এই বিভাগে মক্তব (প্রাথমিক স্তর) উর্ত্তীন ছাত্রদেরকে অভিজ্ঞ হাফেজদের তত্ত¡াবধানে সম্পূর্ণ কুরআন মাজীদ সহীহ-শুদ্ধরুপে মুখস্থ করানো হয়।

কিতাব বিভাগ:
এই বিভাগে দারুল উলুম দেওবন্দের সিলেবাসের অনুকরনে ১০ বৎসরে পূর্ণাঙ্গ আলেমরূপে গড়ে তোলা হয়। এই বিভাগে মক্তব, হিফজ সমাপনকারী ছাত্রদেরকে পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে কুরআন, হাদীস, ফিকাহ, তাফসীর, আকাঈদ, আদব, নাহু, সরফ, বালাগাত, মানতেক ইত্যাদি যাবতীয় ধর্মীয় বিষয়ে পূর্ণ পারদর্শী করে বিজ্ঞ আলেমরুপে গড়ে তোলা হয় এবং তাদেরকে সর্বব্যাপী দ্বীনি খেদমত আঞ্জাম দানের জন্য সনদ প্রদান করা হয়।

ফতোয়া বিভাগ:
সাধারণ জনগণ ব্যক্তিগত, পরিবারিক, সমাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের নানা প্রেক্ষাপটে যে সকল সমস্যা ও জটিলতার সম্মুখীন হয়ে থাকে, শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে সে সকল সমস্যার বিশুদ্ধ, বাস্তবভিত্তিক ও শরীয়তসম্মত সমাধান এই বিভাগের অভিজ্ঞ মুফতিগণের দ্বারা প্রদান করা হয়ে থাকে। 

সাধারণ জ্ঞান প্রশিক্ষণ বিভাগ

প্রতিটি ছাত্র যাতে ইলমে ওহীর মাধ্যমে সমকালীন সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে, সেজন্য জামিয়ার পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়ে থাকে।

ছাত্র পাঠাগার:
দরসে নেজামীর (কওমী শিক্ষা সিলেবাস) পাশাপাশি জ্ঞানের পরিধিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুবিশাল দিগন্তে বিস্তৃত করার লক্ষ্যে রয়েছে একটি বিশাল সমৃদ্ধশালী পাঠাগার। সালফে সালেহীনের জীবনাদর্শ ও তাদের চিন্তাধারা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জাতিসত্তার বিকাশ ও লালনকল্পে শিক্ষার্থীর জ্ঞানের ঝুলিকে আরো সমৃদ্ধ করার সুযোগ এই পাঠাগার থেকে পেয়ে থাকে।

 দেয়ালিকা প্রকাশঃ বর্তমানে দেশের সাহিত্যর্চচা একশ্রেণির কুচক্রি ও পশ্চাত্যমুখী বিকৃত কলম ব্যবসায়ীদের হস্তগত, তাদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার ও ইসলামী সাহিত্যের স্বচ্ছ নির্মল জ্যোতি বিকিরণের লক্ষ্যে ছাত্রদের লেখা আরবি-বাংলা দেয়ালিকা প্রকাশ করা হয়ে থাকে। যার মাধ্যমে ছাত্রদের মধ্য থেকে ভালো লেখক তৈরী হচ্ছে। 

প্রতিযোগিতামূলক বক্তৃতা প্রশিক্ষণ:
কুরআন হাদীসের জ্ঞানার্জনের পর সর্বসাধারণের মাঝে দ্বীনি দাওয়াতের ব্যাপক প্রচার-প্রসার যোগ্যতা অর্জনের জন্য ছাত্রদের বাকশক্তি পরিস্ফুটিত করার লক্ষ্যে জামিয়ার পক্ষ থেকে অভিজ্ঞ ওস্তাদদের তত্বাবধানে যুগোপযোগী বিভিন্ন নির্ধারিত বিষয়ের ওপর প্রতিযোগিতামূলক বক্তৃতা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। যাতে ছাত্রগণ ভালো ওয়ায়েজ ও মুফাচ্ছিরে কুরআন হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

অন্যান্য প্রশিক্ষণ:
সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের এই দূর্যোগপূর্ন মুহূর্তে সরলপ্রাণ মুসলমানদের ঈমান আকীদা হরণকারী বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদের ওপর কর্মশালা, সমকালীন সামাজিক সমস্যাবলীর ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধানকল্পে আলোচনা সভা, বিতর্ক-বাহাস, সেমিনার ও লেখালেখি ইত্যাদি এই প্রশিক্ষণের উল্লেখযোগ্য দিক। 

 জামিয়ার সেবা বিভাগ

জামিয়ার পক্ষ থেকে দেশ ও জাতির কল্যাণে বিভিন্ন সেবামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। নিম্নে সে সব প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো-
১.    ফারায়েজ বিভাগ: এই বিভাগে কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ওয়ারিসদের মধ্যে বন্টন কাজে সহযোগিতা করা হয়ে থাকে।
২.    দাওয়াত ও তাবলীগ বিভাগ: ইলমে দীন অর্জনের সাথে সাথে নায়েবে রাসুলের দায়িত্ব পালনার্থে এবং নিজ আমলের উন্নতির লক্ষ্যে দাওয়াত ও তাবলীগের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মুরুব্বিদের পরামর্শ অনুযায়ী দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক মেহনতের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়।

এছাড়াও প্রতি ছুটির বিরতিতে তাবলীগি মুরুব্বী ও উস্তাদগণের প্রচেষ্টায় ছাত্রদেরকে তিনদিন, সাতদিন, দশদিন, চিল্লায় ও সালে পাঠানো হয়।

৩.    দুস্থ মানবতার সেবা: রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত পালনার্থে জামিয়ার ছাত্র-শিক্ষকগণ বন্যা, ঘূর্নিঝড় সিডর, আয়লা, সুনামি ইত্যাদি দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে অসহায় দুঃখী মানুষের পাশে সর্বাত্মক সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে হাজির হয়ে থাকেন।

 সেবামূলক অন্যান্য কার্যক্রমঃ আগ্রহী, কর্মঠ, ছাত্র ও জনসাধাণের উপকারার্থে বিভিন্ন সময় ইসলাহী মজলিস, কেরাত, নাহু, সরফ, মুয়াল্লিম ইত্যাদি প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়ে থাকে। মোট কথা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া সার্বিক দিক বিবেচনায় শিক্ষা, সেবা ও সমাজ গঠনের এক মহৎ পরিকল্পনার নাম। আগামীতেও জামিয়া উত্তরোত্তর তার অভিষ্ট লক্ষ্যপানে দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে পারে। সেজন্য সর্বস্তরের শুভাকাক্ষীদের দোয়া ও সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করছি।
 

জামিয়া নুরিয়া ইসলামিয়া